অনেক চেনা জানা রোগের মধ্যে পুরুষদের রাত্রে ধাতু নির্গমন হওয়া বা যাকে বলা হয় স্বপ্নদোষ, খুবই সাধারণ একটি রোগ। স্বপ্নদোষ হ’ল রাত্রে ঘুমের মধ্যে বীর্যপাত হওয়া। বয়ঃসন্ধিকালে স্বপ্নদোষ হওয়া খুবই সাধারণ একটি ঘটনা; ঘুমিয়ে পড়ার পরে নিজে নিজেই বীর্যপাত ঘটে যাওয়াকেই স্বপ্নদোষ বলে। এটিকে সেভাবে রোগ নাও বলা যেতে পারে, এটি আসলে একটি অতি সাধারণ একটি ব্যাপার।
বয়ঃসন্ধিকালের শুরু থেকে যৌবনের শুরু অবধি অনেক যুবকই এটির শিকার হন এবং তার অনেক কারণ থাকতে পারে। যেসব যুবকদের স্বপ্নদোষ হয় তাদের যৌন রুচি, অশ্লীল আচার, অশ্লীল ছবি দেখা, অশ্লীল বই পড়া এবং অশ্লীল চলচ্চিত্র দেখার কারণে রাত্রে বা দিনে ঘুমানোর সময়ে ধাতু নির্গমন হয়ে যেতে পারে।
যৌন রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে স্বপ্নদোষের অনেক কারণ হতে পারে যেমন হস্তমৈথুন, মানসিক মৈথুন, অ-প্রাকৃতিক মৈথুন ও উষ্ণ খাবার খাওয়া, অশ্লীল পরিবেশ ও অস্বাভাবিক হারে মাদক সেবন করলেও স্বপ্নদোষ হতে পারে। এছাড়াও, অনেক যুবকদের মধ্যে কম বয়সে তাদের থেকে বেশি বয়সের মহিলাদের নিয়ে অনেক কাম বাসনা থাকে এবং সেই কাম বাসনা পূরণ না হ’লেই তাদের স্বপ্নদোষ হয়। মাসে যদি স্বপ্নদোষ একবার বা দু’বার হয়, তবে তা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। সাধারণত বিয়ের পরই স্বপ্নদোষের রোগ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যদি তা চলতে থাকে তবে তার চিকিৎসা করা দরকার হয়ে পড়ে। যদি মাসে দু’বারের চেয়ে বেশি স্বপ্নদোষ হয় তবে তার কারণ কি হতে পারে জেনে নিন।
স্বপ্নদোষের কারণ ঃ
১। অশ্লীল চলচ্চিত্র – স্বপ্নদোষের প্রধান কারণ হ’ল অশ্লীল চিন্তন, অশ্লীল চলচ্চিত্র দেখা ও মেয়েদের নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা। মনের মধ্যে কামের উত্তেজনাপূর্ণ চিন্তা করা অথবা কামের বাসনা করাই এই রোগের সবচেয়ে প্রথম কারণ। যদিও অনেক সময়ে শুধু যৌনকর্মের কথা ভাবলেই স্বপ্নদোষ হতে পারে।
২। সঙ্গিনীর থেকে দূরে থাকা – কখনও কখনও সঙ্গিনীর থেকে অনেক দিনের জন্য অনেক দূরে থাকাটাও স্বপ্নদোষের একটা কারণ হতে পারে। প্রেমিক প্রেমিকার মধ্যে প্রবল আকর্ষণের কারণেও স্বপ্নদোষ হতে পারে। স্বপ্নদোষের আরও একটা কারণ হতে পারে অনেক দেরি করে বিয়ে করা।
৩। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও কোষ্ঠকাঠিন্য – পেটের সমস্যা বা কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে অথবা স্নায়ুতন্ত্রের দুর্বলতার কারণেও স্বপ্নদোষ হতে পারে। এছাড়াও, খাবারে বেশি ঝাল মশলার প্রয়োগ করা, সুস্বাদু অথচ অত্যন্ত গুরুপাক খাদ্য সেবন করা ও আয়েশ, বিলাস করে জীবনযাপন করাও কিন্তু এই রোগের একটা কারণ হতে পারে। রাত্রে শুতে যাওয়ার আগে অনেক বেশি খাদ্য সেবনের ফলেও এটা হতে পারে।
৪। দুগ্ধজাত দ্রব্যের অধিক সেবন – অধিক মাত্রায় ঘি বা দুধ অথবা দুগ্ধজাত মণ্ডা বা মিঠাই সেবন করলে কিম্বা রাত্রে শোয়ার আগে খুব বেশি গরম দুধ খাওয়ার ফলে স্বপ্নদোষ হতে পারে। রাত্রে খাবার খাওয়ার পরেই ঘুমিয়ে পড়ার কারণেও ঘুমন্ত অবস্থায় ধাতু নির্গমন হতে পারে।
৫। মানসিক চাপ – কখনও হঠাৎ খুব ভয় পেলে আমাদের শরীর শিথিল হয়ে যায়। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের অপর মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমে যায়। স্বপ্নদোষের এইটাও একটা বড় কারণ হতে পারে।
স্বপ্নদোষ নিয়ে যা যা সাবধানতা অবলম্বন করবেন –
স্বপ্নদোষের চিকিৎসার জন্যে ওষুধ খাওয়ার আগে নিজস্ব আচার ও চিন্তা ভাবনা শুদ্ধ করা দরকার। নিজেকে নিজের শরীরের আধিকারিক বানানো বেশি জরুরি। স্বপ্নদোষের রোগীর জন্য একা থাকাটা একটা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে কারণ একা থাকলে অশ্লীল চিন্তা ভাবনা করার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যেমন আগে বলা হ’ল, স্বপ্নদোষের কারণ পেটের সমস্যাও হতে পারে। সুতরাং স্বপ্নদোষের সমস্যা মেটাতে গেলে এইদিকগুলো খেয়াল রাখতে হবে।
- এটি সম্পূর্ণ মানসিক একটি রোগ। নিজের মনকে পরিষ্কার রাখুন।
- ঠাণ্ডা জলে স্নান করুন।
- রাত্রে গরম দুধ খাবেন না।
- ঘুমানোর আগে পায়ের তালু থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঠাণ্ডা জলে ধুয়ে নিন।
- সেইসব বই পড়বেন না যা আপনার মনে উত্তেজনার সৃষ্টি করতে পারে।
- রাত্রে শোয়ার প্রায় ৩ ঘণ্টা আগে খাবার ও পানীয় খেয়ে নিন।
- শোয়ার সময় সোজা হয়ে শোয়ার চেষ্টা করুন।
- শোয়ার আগে ভাল কোনও বই পড়তে পারেন যাতে আপনার মনে ভাল চিন্তা আসে।
- কোষ্ঠকাঠিন্য হলে তাড়াতাড়ি তার প্রতিকার করুন।
- লিঙ্গের চারপাশে গুপ্ত লোম বেশি বাড়তে দেবেন না।
- শুতে যাওয়ার আগে প্রস্রাব করতে হবে।
- গুপ্তাঙ্গের ওপরের চামড়া নিয়মিত ছাড়িয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
শোয়ার সময় অন্তর্বাস খুলে শুতে হবে। হালকা ও ঢলঢলে সুতির জামা প্যান্ট পরে শোবেন। পা এবং হাত ভাল করে ধুয়ে সোজা হয়ে শুতে হবে। এর ফলে স্বপ্নদোষ হবে না।
স্বপ্নদোষ (Nocturnal emission) ও তার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
স্বপ্নদোষের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথিক ওষুধ অনেক কার্যকর হতে পারে। তবে ওষুধের নির্বাচন রোগীর লক্ষণ, মানসিক অবস্থা, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত উপসর্গের উপর নির্ভর করে। নিচে ১০টি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ এবং তাদের ব্যবহার লক্ষণ আলোচনা করা হলো:
১. Calcarea Carbonica
- লক্ষণ: স্বপ্নদোষের পাশাপাশি দুর্বলতা, ক্লান্তি, এবং অতিরিক্ত ঘাম দেখা যায়। রোগী সাধারণত স্থূলকায় হয় এবং অল্প কাজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
- মানসিক লক্ষণ: দুশ্চিন্তা, ভয় এবং মানসিক চাপ থাকা।
২. Phosphoric Acid
- লক্ষণ: শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতার সঙ্গে স্বপ্নদোষ হয়। যৌন উত্তেজনা হ্রাস পায় এবং বীর্যপাতের পর অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভূত হয়।
- মানসিক লক্ষণ: বিষণ্ণতা এবং উদাসীনতা।
৩. Staphysagria
- লক্ষণ: অতিরিক্ত যৌন উত্তেজনার কারণে ঘন ঘন স্বপ্নদোষ হয়। হস্তমৈথুন বা যৌনচিন্তা অতিরিক্ত থাকলে এই ওষুধ কার্যকর।
- মানসিক লক্ষণ: হতাশা, অপমানিত বোধ করা এবং ক্রোধ দমিয়ে রাখা।
৪. Lycopodium
- লক্ষণ: যৌন দুর্বলতা ও অল্পতেই বীর্যপাত হয়। যৌন ক্ষমতা কমে যায় এবং বীর্যের গুণমানও খারাপ হয়।
- মানসিক লক্ষণ: আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং সামাজিক ভীতি।
৫. Silicea
- লক্ষণ: কম যৌন শক্তি, অতিরিক্ত ঘাম এবং দুর্বলতা। শরীরের স্নায়ুতন্ত্র দুর্বল থাকে, যার ফলে রাতে ঘন ঘন বীর্যপাত হয়।
- মানসিক লক্ষণ: অতি সংবেদনশীল এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব।
৬. Natrum Muriaticum
- লক্ষণ: স্বপ্নদোষের কারণে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রোগী ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে যায়। যৌন উত্তেজনা এবং লজ্জাবোধ।
- মানসিক লক্ষণ: একাকীত্ব, বিষণ্ণতা এবং দুঃখবোধ।
৭. Agnus Castus
- লক্ষণ: যৌন শক্তির সম্পূর্ণ হ্রাস। যৌন কামনা কমে যায় এবং বীর্যপাতের পর তীব্র ক্লান্তি অনুভব হয়।
- মানসিক লক্ষণ: হতাশা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব।
৮. Nux Vomica
- লক্ষণ: অতিরিক্ত মানসিক চাপ, মদ্যপান বা ধূমপানের ফলে স্বপ্নদোষ হয়। পেটের সমস্যা, অম্লতা ও হজমের সমস্যা সহ স্বপ্নদোষের উপসর্গ দেখা যায়।
- মানসিক লক্ষণ: চরম মেজাজ, অধৈর্য, এবং অল্পতেই রেগে যাওয়া।
৯. China (Cinchona Officinalis)
- লক্ষণ: বারবার বীর্যপাত ও স্বপ্নদোষের ফলে শারীরিক দুর্বলতা। যৌন উত্তেজনা এবং বারবার বীর্যপাতের ফলে শরীরের শক্তি হ্রাস পাওয়া।
- মানসিক লক্ষণ: মানসিক অবসাদ এবং অলসতা।
১০. Sulphur
- লক্ষণ: স্বপ্নদোষের পাশাপাশি শরীরের অন্য কোনো অংশে সমস্যা যেমন ত্বকের রোগ দেখা যায়। অত্যধিক যৌন উত্তেজনা এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপ বেশি থাকা।
- মানসিক লক্ষণ: অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং কিছুটা অহংবোধ।
এই ওষুধগুলো স্বপ্নদোষ নিরাময়ে কার্যকর, তবে সঠিক ওষুধের নির্বাচন এবং ডোজ নির্ধারণের জন্য অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।http://
.png)

0 Comments